আমার স্কুল
মতিঝিল মডেল হাই স্কুল বাসা (বাসাবো) থেকে ২/৩ কিলোমিটার দূরে। আমরা কয়েক (শাহরিয়ার,
শোভন, তারেক) দোস্ত মিলে বাসা থেকে হেঁটে হেঁটে বিশ্বরোড দিয়ে কমলাপুর স্টেশনের
ভিতর দিয়ে চলে যেতাম। তো আমার বাসে তেমন একটা চড়া হয় নাই বা জানি না কোন দিক দিয়ে
কোথায় চলে। একই ভাবে যখন নটরডেম কলেজে পড়তাম মানে স্কুল থেকে ১০ মিনিটের পথ তখনও
হেঁটে যেতাম। তাই তখনও বাসে তেমন একটা চড়া হয় নাই। তবে কলেজ এডমিশনের সময় মনে আছে
“ঢাকা কলেজ” এ এডমিশন দিব কিন্তু তখন (২০০১ সালে) চিনতাম না ঢাকা কলেজে কিভাবে
যেতে হয়। সিয়াম নামে আমাদের স্কুল বন্ধু সে চিনত। সেই মূলত আমাকে চিনাল কিভাবে
যেতে হয়। প্রথমে আমরা তুরাগে করে বৌদ্ধমন্দির থেকে মালিবাগ রেলগেট গেলাম। সেইখান
থেকে গ্রামীন করে মালিবাগ রেলগেট থেকে পল্টন এবং শেষে পল্টন থেকে ৯ নম্বর বাসে চড়ে
সাইন্সল্যাব গেলাম। তখন চিনলাম কিভাবে বাসে করে ঐসব অঞ্চলে যেতে হয়।
যাই হোক ২০০৪
সালে মার্চ মাস থেকে আমাদের বুয়েটের প্রথম ক্লাস শুরু হয়। তো প্রথম প্রথম আমি
বিভিন্ন ভাবে বুয়েটে গিয়েছি। নিচে বিভিন্ন রুট গুলো সংক্ষেপে দেওয়া হলঃ
১. তুরাগ বাস
(বাসাবো-মালিবাগ); গ্রামীন (মালিবাগ-পল্টন); ৯ নম্বর বাস (পল্টন-পলাশী)
২. তুরাগ বাস
(বাসাবো-মালিবাগ); হেঁটে (মালিবাগ রেলগেট- মগবাজার রেলগেট); রিক্সা
(মগবাজার-বুয়েট)
৩. রিক্সা
(বাসাবো-বুয়েট)
৪. টেম্পু
(বাসাবো-গুলিস্তান); ৭ নম্বর বাস (গুলিস্তান-বকশিবাজার)
৫. ম্যাক্সি
(বাসাবো-ফকিরাপুল); ১১ নম্বর বাস(ফকিরাপুল-সেগুনবাগিচা); রিক্সা
(সেগুনবাগিচা-বুয়েট) ইত্যাদি।
এরকম কিছুদিন
যাওয়ার পর জানলাম যে, বুয়েটের বাস বিভিন্ন রুটে আছে সকালে ছাত্র-ছাত্রীদের বুয়েটে
নিয়ে আসে সকাল ৭:৪৫ নাগাদ, দুপুরে বুয়েট থেকে ছাড়ে ১:২০ নাগাদ এবং বিকালে আরেকবার
ছাড়ে ৫:৩০ এ। তো প্রথমদিন আমি বাড্ডা রুটের বাসে উঠলাম যেহেতু এই বাসটি মালিবাগ
রেলগেট দিয়ে যায়। তো বাসে উঠে দেখি পরিচিত অনেকেই আছে কাজী, সিয়াম, সফিউর, নোমান,
সুপাক, তারেক, মজিদ এবং অনেক মেয়েও ছিল যদিও তাদের নাম জানতাম না কিন্তু সানরাইজ
এবং ওমেকা তে কোচিং করার কল্যাণে প্রায় অনেক কেই পরিচিত মনে লাগল। তো যাই হোক প্রথমদিন
যাওয়া শুরু করলাম কিছুক্ষন পরেই মামা আসলেন টিকিট নেওয়ার জন্য ... আমি বাসে জানমাল
যে টিকিট দিতে হয় কিন্তু টিকিট পাবো কোথা থেকে তা জানতে জানতে মামা চলে আসলেন
বললেন এই মামা টিকিট দেন আমি বললাম টিকিট তো নাই আপনি টাকা নেন। মামা বললেন আমাদের
টাকা নেওয়ার এখতিয়ার নাই আপনি ক্যাম্পাসে টিকিট কিনে নিয়েন। পরে বাসে আলোচনা করতে
করতে আরও জানলাম এ এক জটিল ধরন ... প্রথমে স্লিপ আনতে হবে রেজিস্ট্রার বিল্ডিং
থেকে ঐ স্লিপে কি লেখতে হবে তার জন্য যেতে হবে অটোমোবাইল ডিপার্টমেন্টে ... সেই
স্লিপে লেখা সহ যেতে হবে বুয়েট সোনালী ব্যাংকে ... সেই খানে লাইনে দাড়িয়ে থেকে টাকা
জমা দেওয়ার পর ব্যাংক থেকে ফেরতকৃত স্লিপ অটোমোবাইল ডিপার্টমেন্টে ফেরত দিয়ে টিকিট
সংগ্রহ করতে হবে। এই প্রসেস শুনেই আমার জ্বর আসার মত উপক্রম। যাই হোক কোনও রকমে
সংগ্রহ করলাম টিকিট। তো সেই সময়ে কিছু রুটে বাস চালু ছিল ।
![]() |
| বুয়েট বাস |
যেই রুট গুলো ছিল
তা হলঃ
১. মিরপুর রুট
২.
উত্তরা-এয়ারপোর্ট রুট
৩. যাত্রাবাড়ী
রুট
৪. সানাড়পারা রুট
৫. বাড্ডা রুট
৬. স্টাফ বাস
তো আমরা যারা
ঢাকার পূর্বাঞ্চলে থাকতাম মানে কমলাপুর, মুগদা, বাসাবো, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর
ইত্যাদি এলাকার ছাত্র-ছাত্রীরা বুয়েট বাসের রুটে বঞ্চিত ছিলাম। আমরা ৭/৮ জন (কাজী,
সিয়াম, শফিউর, নোমান, সিদ্দিকুজ্জামান, সুপাক, মামুন, তারেক) যারা ঐ বাড্ডা রুটের
বাসকে ধরার জন্য ৭:১০ এর মধ্যে মালিবাগ রেলগেটে উপস্থিত থাকতাম। এভাবে অনেকদিন ই
আমরা বাস মিস করেছি। বিশেষ করে আমরা যারা বাসাবো থেকে আসতাম তারা মালিবাগ রেলগেট
আসতে জ্যামে পরতাম। কেননা সে সময় খিলগাঁও ফ্লাই-ওভারের কাজ পুরোদমে চলছিল আর ঐ
সংলগ্ন এলাকায় ছিল অস্বাভাবিক জ্যাম।
তো যাই হোক আমরা
যারা ঐ বাসাবো-খিলগাও রুটের ছিলাম তারা প্রায়শই বুয়েট এ আলোচনা করতাম এবং এই
আলোচনা হত বাসে যাওয়ার আগে আমরা যারা আড্ডা দিতাম। একদিন আলোচনা করতে করতে এই
প্রসঙ্গে আলোচনা হল যে, বুয়েটে এত ছাত্র-ছাত্রী পড়ে তাদের ঢাকার অংশের বেশিরভাগ
ছাত্র-ছাত্রী আসে নটরডেম কলেজ, ভিকারুন্নিসা কলেজ, ঢাকা কলেজ এবং হলিক্রস কলেজ
থেকে এবং এই নটরডেম-ঢাকা কলেজের ছেলেরা
আবার মতিঝিল মডেল হাই স্কুল, মতিঝিল সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল
থেকে চান্স পায় এবং ভিকারুন্নিসা-হলিক্রস কলেজের মেয়েরা আবার চান্স পায় ঐ মতিঝিল
মডেল হাই স্কুল, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল, মতিঝিল সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়,
সিদ্ধেশরী স্কুল এবং আরও অন্যান্য স্কুল থেকে (যদিও কথাটার উপর অনেকেই
ভিত্তি পাবেন না ... কিন্তু বাস্তবতা কিন্তু কোনও অংশে কম না) যার বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীদের বাসা ঐ
পুর্বাঞ্চলে তথা মুগদা, বাসাবো, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর। এই আলোচনা করার উদ্দেশ্য
ছিল এই যে, এইসব এলাকা বাসা আছে এমন অনেক ছাত্র-ছাত্রী বুয়েট এ পড়তেন কিন্তু এই
রুটে একটি বুয়েট বাস নাই। উদাহারন হিসেবে আমরা অনেককেই বলতে শুনি ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস আছে যা আরামবাগ থেকে কমলাপুর হয়ে মুগদা বাসাবো হয়ে
শাহজাহানপুর দিয়ে বেরিয়ে কাকরাইল হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকে যায়
তাও একটা বাস না একই সময়ে একাধিক বাস আছে। আর এই বাস গুলো তো বিভিন্ন সময়ে আসেই।
এই আলোচনা গুলো প্রায়ই হত কিন্তু ঐ আলোচনা পর্যন্তই থাকতো।
এভাবে কস্টে
শিষ্টে আমরা এক টার্ম পার করে দিলাম। কিন্তু আমাদের প্রথম টার্ম শেষ করতে প্রায় ১০
মাস লেগে গেল। আমরা পি.এল (প্রিপারেশন লিভ)কাটিয়েছিলাম প্রায় সাড়ে তিন মাস কেননা
২০০৪ সালের বন্যা, হলে পানি উঠা এবং ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ, ২১ শে আগস্ট ততকালীন
বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার উপর গ্রেনেড হামলা ইত্যাদি কারণে ওয়ান ওয়ান শেষ
করতে করতে আমাদের ২০০৪ সাল শেষ হয়ে যায়। তো ওয়ান টু শুরু হয় ডিসেম্বরের ১১ তারিখে
এবং ঐ সময় আমাদের পরের ব্যাচ ২০০৪ ও আমাদের সাথে ক্লাস শুরু করল ফলে দেখা গেল অন্য
রুটের বাসে সব সীট ভরেও নাই অথচ বাড্ডা রুটের বাসে অনেকেই উঠতে পারছে না। তো এই
সমস্যা দেখে আমরা সিনিয়র কিছু ভাইদের সাথে আলোচনা করলাম তারা বললেন ডি.এস.ডব্লিউ (ডিরেক্টরেট
অব স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার বা ছাত্র কল্যাণ পরিষদ) বরাবর অন্ততঃ শতাধিক ছাত্র-ছাত্রীর
স্বাক্ষর সহ চিঠি প্রেরণ করতে। তো চিঠি কে লিখেছিল তা মনে নেই তবে চিঠি লেখে
শতাধিক ছাত্র-ছাত্রীর স্বাক্ষর নিয়ে তা ডি.এস.ডব্লিউ তে প্রেরণ করা হয়েছিল।
সম্ভবতঃ সেই কারনেই আলাদা বাস রুট করা হয় যা বাসাবো-বাড্ডা রুট হিসেবে প্রদান করা
হয়। এবং এই রুটটি এমনভাবে করা হয় যা সম্ভাব্য সকল রুটকে কাভার করে। তারিখটা মনে নেই তবে খিলগাঁও ফ্লাইওভার চালু হবার পর পরই এই রুট চালু করা হয় মানে মার্চ, ২০০৫ এর পর।
বাসাবো-বাড্ডা
রুটঃ বুয়েট-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টি.এস.সি-শাহবাগ-রমনা-কাকরাইল-বেইলি
রোড-মালিবাগ-রাজারবাগ-শহীদবাগ-মতিঝিল-আরামবাগ-কমলাপুর-টি.টি.পাড়া-মুগদা-বাসাবো-খিলগাও-মালিবাগ
রেলগেট-রামপুরা-বাড্ডা।
![]() |
| বুয়েট বাসের বাসাবো-বাড্ডা রুট |
খুব খুশি লাগল এই ভেবে যে আর অন্য বাস উঠে বুয়েটের বাস ধরতে হবে না বা বুয়েট বাস থেকে দূরে কোথাও নেমে অন্য কোনও বাস ধরে বাসা আসতে হবে না সরাসরি বুয়েটের বাস ই বাসার সামনে দিয়ে যাবে। আমরা যারা উদ্যোগ নিয়েছিলাম তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানালাম আর এইভাবে চালু হল বাসাবো-বাড্ডা রুট বুয়েট বাস।
তবে বাসের টিকিট
নিয়া কাহিনী আছে। আমি ঐ যে ২টা টিকটের বই কিনেছিলাম যাতে ২০০ খানা টিকেট আছে ঐ
টিকিট দিয়ে ৪ টার্ম কাটিয়ে দিয়েছিলাম। বেশিরভাগ দিনই টিকেট দিতাম না। আমার দেখা
দেখি আরও কয়েকজন দিত না।তখন শুনতে পেলাম অন্যান্য রুটেও একই অবস্থা। এই শুনে ততকালীন
ভিসি সিদ্ধান্ত নিলেন যে সকলকে বাসের টিকেট দিতে হবে যে দিবে না তার ছবি বড় করে
বুয়েট ক্যাম্পাসে টানিয়ে রাখা হবে ... এই শুনে আরও অনেকেই টিকেট দেওয়া বন্ধ করে
দিল কারন তখন তারা ভাবল এই সুযোগ পুরো ক্যাম্পাসে রাতারাতি স্টার হয়ে যাওয়া যাবে।
পরবর্তীতে অবশ্য সবাই আবার ঠিকঠাক মত টিকেট দেওয়া শুরু করল।

